নির্বাচনের পূর্বরাতে ঢাকার বুকে গভীর নিস্তব্ধতা: সতর্ক প্রশাসন, প্রত্যাশী জনতা
রাত গভীর, কিন্তু ঢাকাবাসীর ঘুম যেন উধাও। কারণ, আজ রাত পোহালেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের ঠিক আগের রাতে রাজধানী ঢাকা যেন এক ভিন্ন চেহারায়। শহরজুড়ে নেমে এসেছে অস্বাভাবিক এক নিস্তব্ধতা, যা আসন্ন বড় কিছুর জানান দিচ্ছে।
ঘড়ির কাঁটা তখন রাত ১০টা ছুঁইছুঁই। সাধারণ ব্যস্ত সময়েও শহরজুড়ে এক অদ্ভুত থমথমে নীরবতা। নিউমার্কেট এলাকায় মোটরসাইকেলে সরেজমিনে পরিস্থিতি দেখতে বেরোতেই দেখা মিলল সেনাবাহিনীর দ্রুতগামী জিপের। মুহূর্তেই আরেকটি গাড়ি সামনে এসে ব্রেক কষে দাঁড়ায়। সংক্ষিপ্ত পরিচয় পর্ব শেষে সাইরেনের শব্দে মিশে গেল সতর্কতার বার্তা। নীলক্ষেত মোড়ে রাতের আড্ডা, কোলাহল, ফুটপাতের বিকিকিনি আজ সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। হাতেগোনা কিছু মানুষ আর বন্ধ দোকানের শাটার জানান দিচ্ছে এক চাপা উত্তেজনা। ফাঁকা মিরপুর রোড দিয়ে দু-একটি বাস তীব্র গতিতে ছুটে যাচ্ছে।
তবে এই নীরবতার মাঝেও রাজনীতির স্পন্দন সুস্পষ্ট। ঢাকা কলেজ, টিচার্স ট্রেনিং কলেজ এবং সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকার চিত্র কিছুটা ভিন্ন। এখানে নির্বাচনি টেবিল ঘিরে কর্মী-সমর্থকদের কর্মব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো। ভোটার তালিকা সাজানো থেকে শুরু করে ফিসফাস আলোচনা, সবখানেই এক উৎসবের আমেজ। নীরব শহরের বুকে যেন প্রাণবন্ত রাজনীতির ঢেউ।
গাউছিয়া থেকে বাটা সিগন্যাল পেরিয়ে কাঁটাবন, শাহবাগ পর্যন্ত জনশূন্য প্রায়। যে শাহবাগ চত্বর ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অগ্নিগর্ভ স্মৃতির সাক্ষী, সেই ঐতিহাসিক স্থানটিও আজ নিস্তব্ধ, যেন এক গভীর অপেক্ষায়। দু-একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা দেখা গেলেও বেশিরভাগই যাত্রীবিহীন অবস্থায়।
বাংলামোটর থেকে কারওয়ান বাজারের সার্ক ফোয়ারা পর্যন্ত রাস্তা একেবারেই ফাঁকা। মাঝেমধ্যে টহলরত সেনা ও বিজিবির গাড়ি দ্রুতগতিতে চলে যাচ্ছে। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে মিন্টু রোডে দেখা গেল পুলিশের শক্ত ব্যারিকেড। প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনের দিকে যাওয়া সব যানবাহন ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের চিরচেনা রাতের কোলাহলও আজ অনুপস্থিত। নিস্তব্ধতার চাদরে মোড়া পুরো ক্যাম্পাস। ঢাকা মেডিকেল, চানখাঁরপুল, বকশিবাজার, আজিমপুর এলাকাতেও মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো কম। আজিমপুর কবরস্থানের সামনে কয়েকজনকে ট্রাকে উঠতে দেখা গেল, হয়তো দূরপাল্লার যাত্রী। তাদের মুখে ছিল ক্লান্তির ছাপ, স্বজনদের থেকে বিদায় নিয়ে হয়তো ফিরে যাচ্ছেন নিজ ঠিকানায়।
যদিও জনসমাগম কম, শহরের প্রতিটি অলিগলি ভরে আছে নির্বাচনি ব্যানার-ফেস্টুনে। দলীয় প্রতীক আর প্রার্থীর হাসিমুখের ছবি যেন শেষ মুহূর্তের প্রচারণার দৃশ্যমান প্রমাণ। নির্বাচনের আগের রাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল চোখে পড়ার মতো। নীরবতার আড়ালে তাদের সতর্ক প্রস্তুতি স্পষ্ট। রাজধানীসহ সারা দেশের মানুষ এখন একযোগে অপেক্ষা করছে ভোরের আলোর জন্য। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আগামীকাল নাগরিকরা তাদের পছন্দের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারবে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বারবার যে প্রত্যাশার কথা বলেছেন, 'এবারের নির্বাচন ইতিহাসের সেরা নির্বাচন হবে', নীরব ঢাকাও যেন সেই প্রতিশ্রুতির ভোরের অপেক্ষায়।





