ফিলিস্তিনের নাকবা: ইসরায়েলের জন্ম ও এক জাতির বিপর্যয় | আন্তঃবাণী - বাংলায় সারাবিশ্ব
১৯৪৮ সালে জন্ম নেয় ইসরায়েল রাষ্ট্র, আর একই সাথে শুরু হয় ফিলিস্তিনিদের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি—নাকবা। লক্ষ লক্ষ মানুষ হারায় ঘরবাড়ি, বাস্তুচ্যুত হয় প্রজন্মের পর প্রজন্ম। কিভাবে ঘটেছিল এই ইতিহাসের করুণ অধ্যায়?
ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ও রক্তাক্ত সংঘাতগুলোর একটি—ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন প্রশ্ন। আজ থেকে ৭৫ বছর আগে শুরু হওয়া এই দ্বন্দ্ব শুধু দুই জাতির নয়, বরং পুরো বিশ্বের রাজনীতিকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
কিন্তু কীভাবে শুরু হয়েছিল এই সংঘাত? কেন ফিলিস্তিনিরা তাদের জন্মভূমি হারালো, আর কিভাবে জন্ম নিল ইসরায়েল রাষ্ট্র? চলুন, খুঁজে দেখি ইতিহাসের সেই করুণ অধ্যায়—যার নাম নাকবা।
অধ্যায় ১: অটোমান সাম্রাজ্যের পতন ও ব্রিটিশ ম্যান্ডেট
“প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে ফিলিস্তিন ছিল অটোমান সাম্রাজ্যের অংশ। কিন্তু যুদ্ধ শেষে সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ে, আর ফিলিস্তিন চলে যায় ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণে।
এই সময়েই ১৯১৭ সালের বেলফোর ঘোষণা-তে ব্রিটেন প্রতিশ্রুতি দেয়—ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য একটি জাতীয় আবাসভূমি গড়ে তুলবে। অথচ তখন ফিলিস্তিনের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯০% ছিল আরব মুসলিম ও খ্রিস্টান।
এই ঘোষণাই ছিল পরবর্তীতে শুরু হওয়া দ্বন্দ্বের বীজ।”
অধ্যায় ২: ইহুদি অভিবাসন ও আরবদের ক্ষোভ
“২০ শতকের প্রথম দিকেই ইউরোপ থেকে হাজার হাজার ইহুদি ফিলিস্তিনে অভিবাসন শুরু করে। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসিদের হাতে হলোকাস্টে কোটি মানুষের মৃত্যু ইহুদিদের জন্য নিরাপদ রাষ্ট্রের দাবি আরও জোরালো করে তোলে।
অন্যদিকে আরব জনগোষ্ঠী দেখছিল—তাদের জমি ক্রমে দখল হয়ে যাচ্ছে। গ্রাম থেকে গ্রাম উচ্ছেদ হচ্ছে, নতুন নতুন বসতি গড়ে উঠছে। এতে তাদের ক্ষোভ আরও বাড়তে থাকে।”
অধ্যায় ৩: জাতিসংঘের বিভাজন পরিকল্পনা
“১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ ঘোষণা করে—ফিলিস্তিনকে ভাগ করা হবে দুই রাষ্ট্রে। প্রায় ৫৫% জমি দেয়া হবে ইহুদিদের, আর ৪৫% জমি থাকবে আরবদের জন্য।
কিন্তু সমস্যা হলো—তখন ইহুদিরা জনসংখ্যার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ হলেও তাদেরকে অর্ধেকের বেশি জমি দেয়া হয়। ফিলিস্তিনিরা ও আরব দেশগুলো এটিকে সরাসরি অন্যায় ও উপনিবেশবাদী ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখল।”
অধ্যায় ৪: ইসরায়েলের জন্ম ও আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ
“১৯৪৮ সালের ১৪ই মে—ডেভিড বেন গুরিয়ন ঘোষণা করেন ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্ম। ঘোষণা দিয়েই শুরু হয় প্রথম আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ।
মিশর, সিরিয়া, জর্ডান, ইরাকসহ প্রতিবেশী আরব দেশগুলো আক্রমণ চালালেও, ইসরায়েল শুধু টিকে যায়নি—বরং জাতিসংঘের ঘোষিত সীমানার বাইরে আরও জমি দখল করে নেয়।
যুদ্ধ শেষে ইসরায়েল নিয়ন্ত্রণে নেয় মোট ৭৮% ফিলিস্তিন ভূমি।”
অধ্যায় ৫: নাকবা – বিপর্যয়ের ইতিহাস
“এই যুদ্ধের সবচেয়ে করুণ ফল ভোগ করে সাধারণ ফিলিস্তিনিরা। প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার মানুষ তাদের ঘরবাড়ি হারিয়ে শরণার্থী হয়ে যায়।
৫০০-রও বেশি গ্রাম ধ্বংস করে ফেলা হয়। অনেক পরিবার রাতারাতি সবকিছু হারিয়ে জর্ডান, লেবানন, সিরিয়া কিংবা গাজায় পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
ফিলিস্তিনিরা এই ঘটনাকে বলেন নাকবা, অর্থাৎ ‘মহাবিপর্যয়’। যা তাদের জাতীয় স্মৃতিতে এক গভীর ক্ষতের মতো থেকে গেছে।”
অধ্যায় ৬: শরণার্থী সংকট ও প্রজন্মের বেদনা
“আজও লক্ষ লক্ষ ফিলিস্তিনি শরণার্থী শিবিরে দিন কাটাচ্ছেন। নতুন প্রজন্মের শিশুরা জন্ম নিচ্ছে শিবিরেই—যারা কখনো তাদের পূর্বপুরুষের জমি চোখে দেখেনি।
তবুও তারা এখনো বয়ে বেড়াচ্ছে ফেরার অধিকার—‘রাইট অব রিটার্ন’। কিন্তু সেই স্বপ্ন আজও অধরা।”
অধ্যায় ৭: আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও সংঘাতের ধারাবাহিকতা
“ইসরায়েলের জন্ম শুধু ফিলিস্তিনি আরবদের নয়, পুরো আরব বিশ্বের জন্য এক আঘাত হয়ে আসে।
১৯৫৬ সালের সুয়েজ যুদ্ধ, ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধ, ১৯৭৩ সালের ইয়োম কিপুর যুদ্ধ—প্রতিটি সংঘাতই মধ্যপ্রাচ্যকে করেছে অস্থিতিশীল।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর সমর্থনে ইসরায়েল ক্রমেই শক্তিশালী হয়েছে। আর ফিলিস্তিনিরা গড়ে তুলেছে প্রতিরোধ আন্দোলন, যেমন পিএলও, হামাস ইত্যাদি।
শান্তিচুক্তির প্রচেষ্টা হয়েছে বারবার—অসলো চুক্তি থেকে ক্যাম্প ডেভিড পর্যন্ত। কিন্তু সমাধান আজও আসেনি।”
অধ্যায় ৮: বর্তমান প্রেক্ষাপট
“আজ পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকায় বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের জীবন কঠিন বাস্তবতায় আটকে আছে। পশ্চিম তীরে একের পর এক ইসরায়েলি বসতি স্থাপন করা হচ্ছে। গাজায় চলছে অবরোধ, হামলা আর প্রতিশোধমূলক রকেট হামলা।
ইসরায়েল দাবি করে তাদের নিরাপত্তার জন্য এ সব পদক্ষেপ জরুরি। আর ফিলিস্তিনিরা বলে—তাদের মাতৃভূমি প্রতিদিন টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে।”
“ইসরায়েলের জন্ম আর ফিলিস্তিনিদের নাকবা—এটি কেবল একটি রাজনৈতিক সংঘাত নয়। এটি মানব ইতিহাসের এক করুণ অধ্যায়, যেখানে রাষ্ট্র গঠনের আনন্দ মিশে আছে লাখো মানুষের বেদনায়।
আজও যখন গাজা বা পশ্চিম তীর থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখি, তখন মনে হয়—১৯৪৮-এর সেই নাকবার প্রতিধ্বনি এখনো থামেনি।”
“এমনই ইতিহাসের গভীর কাহিনি জানতে সঙ্গে থাকুন আন্তঃবাণী – বাংলায় সারাবিশ্ব। সাবস্ক্রাইব করুন, আর ইতিহাস ও সত্য জানার এই যাত্রায় আমাদের সঙ্গী হোন।”





