সম্পর্কে কি আধিপত্য থাকতে পারে!

আধিপত্যের ক্ষত গভীর হয় নিঃশব্দে। যার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাঁর মধ্যে বঞ্চনা, হীনম্মন্যতা, ও ভেতরের বিদ্রোহ জন্ম নেয়। অন্যদিকে, যিনি আধিপত্য বিস্তার করেন, তিনিও সম্পর্কের মাধুর্য হারিয়ে ফেলেন। এমন সম্পর্ক ধীরে ধীরে ভালোবাসার জায়গা থেকে সরে গিয়ে বিষাক্ত বন্ধনে পরিণত হয়।

Oct 26, 2025 - 03:15
Oct 26, 2025 - 03:17
 0
সম্পর্কে  কি আধিপত্য থাকতে পারে!

জীবনযাপন ডেস্ক :

দুটি মানুষের মনের মিল যতই হোক না কেন, শতভাগ বিষয়ে একমত হওয়া প্রায় অসম্ভব। কারণ, মানুষ মানে আলাদা চিন্তা, আলাদা অনুভূতি, আলাদা অভিজ্ঞতা। তবু আমরা অনেকেই চাই, অপরজন আমাদের মতো ভাবুক, আমাদের মতো চলুক। বিশেষ করে জীবনের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মানুষ—জীবনসঙ্গী—তাঁর ওপরই আমরা কখনো কখনো নিজের মত চাপিয়ে দিতে চাই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যেই সম্পর্কে ভালোবাসা ও সম্মানের ভিত্তি থাকা উচিত, সেখানে আধিপত্যের জায়গা আদৌ আছে কি?

দাম্পত্য জীবনে সঙ্গীর উপর জোর কিংবা প্রভাব খাটানোর ব্যাপারটা কেবল দাম্পত্য জীবনকে তিক্ত করে তোলে। সঙ্গীর প্রতি সহমর্মি সেই সাথে আন্তরিক হতে না পারলে, আপনি যতই প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করুন না কেন, মানুষটাকে কেবল মানসিক এবং শারীরিক যন্ত্রণা দেয়া ছাড়া আর কিচ্ছু করতে পারবেন না

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানী ও পিএইচডি গবেষক হাজেরা খাতুন বলেন, “ভালোবাসা কখনো কর্তৃত্বে টেকে না, বরং বোঝাপড়ায় টিকে থাকে।”

একজন মানুষ যখন সঙ্গীর ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে চান, তখন আসলে তিনি সম্পর্কটিকে সংকুচিত করে ফেলেন। সম্পর্ক মানে তো একে অপরের স্বাধীনতার ভেতরেও নিরাপদ থাকা।"

সম্পর্ক সমান্তরাল হোক সবাই চায়। দুজনের মধ্যে একজন যখন আধিপত্য দেখানোর চেষ্টা করেন তখনই মানসিক দ্বন্দ্ব শুরু হয়। সেটি বেড়ে একপর্যায়ে তা বিষিয়ে দিতে পারে দুজনের সম্পর্কের গতিপথ।

এ ধরনের সমস্যা যাতে অনেক বড় হয়ে না দাঁড়ায়, সে জন্য প্রথম থেকেই নিতে হবে কিছু পদক্ষেপ। যেমন—

সতর্ক হওয়া: সঙ্গী আধিপত্য করার চেষ্টা করছে' এমন মনে হলে তখন থেকে সাবধান হতে হবে। সঙ্গীর কোনো বিষয় ভুল মনে হলে তাকে সেটি বোঝাতে হবে। সবসময় চুপ করে থাকার মানসিকতা রাখা যাবে না। এটি করলে এ সমস্যা আরও বড় আকার ধারণ করে। 

কথা বলা: সম্পর্কে দুজনেই একে অপরের কাছে মন খুলে কথা বলতে হবে। সঙ্গীর ভালোলাগা বা খারাপ লাগার বিষয়গুলো না বুঝতে পারলে সম্পর্ক ভালোভাবে আগাতে পারে না। সঙ্গী আধিপত্য দেখালে তার কারণ জানতে চাইতে হবে এবং বিষয়টি খোলামেলাভাবে আলোচনা করতে হবে। 

সঙ্গীর মতামতের প্রাধান্য দেওয়া: যে কোনো ছোটখাটো বিষয়ে একজনের মত অপরের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে সঙ্গীর মতামতকে প্রাধান্য দিতে হবে এবং একে অপরের বোঝাপড়ার মাধ্যমে সিদ্ধান্তে যেতে হবে। 

পজেসিভনেস কাটানো: পজেসিভনেস থেকে উৎপত্তি হতে পারে ঈর্ষা, ভয় ও সঙ্গীর ওপর অবিশ্বাসসহ আরও অনেক কিছু। তাই সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী করতে পজেটিভনেস থেকে সরে আসতে হবে। সঙ্গীর কোনো বিষয় খারাপ লাগলে সেটি নিয়ে খোলামেলা কথা বলতে হবে।

হাজেরা খাতুন আরও বলেন, সামাজিক কাঠামো অনেক সময় পুরুষদের আধিপত্যকে “স্বাভাবিক” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। আবার অনেক পরিবারে নারীও প্রভাব বিস্তার করেন। দুই দিকই অসুস্থ। সম্পর্ক তখনই সুন্দর, যখন উভয়ে বুঝে—“আমরা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নই, পরিপূরক।”

দু'জন যখন দুজনকে বুঝতে পারবেন, দুজনের চাহিদার ব্যাপারে যত্নবান হবেন, তখন আপনাআপনিই নিজেদের মধ্যে মধুর এক সম্পর্ক গড়ে উঠবে। তখন আর সংসার জীবন তিক্ততার মনে হবে না। দু'জনের চাওয়া-পাওয়াকে গুরুত্ব দিন, সঙ্গীকে ভালোবাসুন, তার মন বোঝার চেষ্টা করুন।

অনেকেই বলেন, “আমি তো ওর ভালোর জন্যই বলি।” কিন্তু মনে রাখতে হবে, কারও ভালো চাওয়ার মধ্যেও যদি অন্যজনের স্বাধীনতা হারিয়ে যায়, তাহলে সেটি ভালোবাসা নয়—এটি নিয়ন্ত্রণ। ভালোবাসা কাউকে নিজের মতো বানানো নয়, বরং তার নিজের মতো থাকাকে ভালোবাসা।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মোহিত কামালের ভাষায়, আধিপত্য শব্দটিকে প্রথমে আমাদের বুঝতে হবে। এটি একটি ডমিনেটিং ক্যারেক্টার। কিছু ব্যক্তিত্ব থাকে এ ধরনের। এ ধরনের ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সে নিজেরটা সবচেয়ে বেশি বুঝবে। নিজের দম্ভ, অহংকার, দক্ষতা এবং নিজে যা বলবে তাই ঠিক মনে করে। তারা নিজের দোষ দেখে না।"

সম্পর্ক বিষয় নিয়ে তিনি বলেন, সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অ্যাডজাস্ট করা, অ্যাডাপটেশন করা, অ্যাকসেপ্ট করা। আধিপত্যবাদী বা কর্তৃত্ববাদ চরিত্রে এই বৈশিষ্ট্য থাকা সম্ভব নয়। তাঁর মতে, আধিপত্য সম্পর্কে জটিলতা সৃষ্টি করে। এটি হতে পারে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে, প্রেমিক-প্রেমিকার মধ্যে এবং নানা সামাজিক ব্যক্তির সম্পর্কের ক্ষেত্রেও। একজন যদি কোনো সম্পর্কে আধিপত্য দেখাতে থাকে তাহলে অপর পক্ষের মানুষটি খুব আহত হন। তিনি বলেন, যে কোনো সম্পর্কে কোনো সমস্যা দেখা দিলে কথা বলতে হবে। আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত আসবে। অন্যের দোষ দেখা বন্ধ করে গুণাগুণগুলো দেখলে আধিপত্য অনেকটা কমে যাবে। সবকিছুতে একটা ডেমোক্রেটিভ ভিউ থাকতে হবে।

আধিপত্যের ক্ষত গভীর হয় নিঃশব্দে। যার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, তাঁর মধ্যে বঞ্চনা, হীনম্মন্যতা, ও ভেতরের বিদ্রোহ জন্ম নেয়। অন্যদিকে, যিনি আধিপত্য বিস্তার করেন, তিনিও সম্পর্কের মাধুর্য হারিয়ে ফেলেন। এমন সম্পর্ক ধীরে ধীরে ভালোবাসার জায়গা থেকে সরে গিয়ে বিষাক্ত বন্ধনে পরিণত হয়। 

“কর্তৃত্বে ভয় থাকে, ভালোবাসায় শান্তি।” 

নিজেকে এমন ভাবে তৈরি করুন, যাতে সঙ্গী সম্মান দিতে এবং ভালোবাসতে বাধ্য হয়। জোর করে নয়, তার মনে ভালোবাসা দিয়ে জায়গা করে নিন। তাই যেকোনো বিষয়ে সঙ্গীকে কিছু বলতে হলে বলুন ভালোবাসায় ভরা ভাষায়, বন্ধুত্বের মতো করে! কর্তৃত্বের সুরে নয়।

এবি/এসএফ