ইন্ডিপেন্ডেন্টকে সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা: 'হত্যায় নির্দেশ দিইনি', আইসিটি-কে রাজনৈতিক প্রতিশোধের মঞ্চ বলে দাবি

কোনো গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নেতাকে কখনো বিচার করা উচিত নয়, যদি সে সহিংস বিদ্রোহের মুখে দেশের সংবিধান রক্ষা করার দায়িত্ব পালন করে।

Oct 29, 2025 - 14:59
 0
ইন্ডিপেন্ডেন্টকে  সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা: 'হত্যায় নির্দেশ দিইনি', আইসিটি-কে রাজনৈতিক প্রতিশোধের মঞ্চ বলে দাবি

আন্তঃবাণী প্রতিবেদক: সহিংস আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত বছর গণবিক্ষোভ দমনের সময় প্রতিবাদকারীদের মৃত্যুর জন্য ক্ষমা চাইতে সরাসরি অস্বীকার করেছেন। নির্বাসনে থাকা এই নেত্রী তার বিরুদ্ধে অনুপস্থিতিতে চলমান বিচারকে 'রাজনৈতিক প্রতিশোধমূলক প্রহসন' বলে অভিহিত করেছেন। বুধবার (২৯ অক্টোবর) দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট-কে দেওয়া এক বিরল ও বিস্তৃত সাক্ষাৎকারে তিনি এই মন্তব্য করেন।

ক্ষমা চাওয়ার অস্বীকৃতি ও জবাবদিহিতা

মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে প্রসিকিউটররা শেখ হাসিনার জন্য মৃত্যুদণ্ড চাইছেন। প্রায় ১৫ বছর 'লৌহ কঠিন মুষ্টিতে' দেশ শাসন করার পর গত বছর ক্ষমতা হারিয়ে তিনি বর্তমানে ভারতে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন।

নিহত প্রতিবাদকারীদের পরিবারের কাছে ক্ষমা চাইবেন কিনা—এই প্রশ্নের জবাবে তিনি সরাসরি ক্ষমা না চেয়ে বরং সমবেদনা প্রকাশ করেন। শেখ হাসিনা বলেন, "জাতি হিসেবে আমরা যে প্রতিটি সন্তান, ভাইবোন, আত্মীয় এবং বন্ধুকে হারিয়েছি, তাদের প্রত্যেকের জন্য আমি শোক জানাই" এবং তিনি তার "সমবেদনা অব্যাহত রাখবেন"।

তবে, তিনি বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি এই বিপুল প্রাণহানির জন্য মাঠপর্যায়ে নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে শৃঙ্খলার অভাবকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, "একজন নেতা হিসেবে আমি চূড়ান্তভাবে নেতৃত্বের দায়িত্ব নিলেও, নিরাপত্তা বাহিনীকে ভিড়ের ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছি বা চেয়েছি—এই দাবিটি সম্পূর্ণ ভুল।" তার দাবি, সে সময় সরকারের পদক্ষেপ ছিল "প্রাণহানি কমাতে সদিচ্ছার সঙ্গে" নেওয়া

আইসিটি বিচার 'রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত'

শেখ হাসিনা তার অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি)-এর বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি এটিকে তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের দ্বারা পরিচালিত একটি 'প্রহসন বিচার' হিসেবে উল্লেখ করেন এবং বলেন, এই প্রক্রিয়ায় যদি তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, তবে তিনি "বিস্মিত বা ভীত" হবেন না।

"আইসিটি হলো একটি প্রহসনের আদালত, যা আমার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের নিয়ে গঠিত একটি অনির্বাচিত সরকার দ্বারা পরিচালিত," তিনি বলেন, "এসব বিরোধীপক্ষ আমাকে সরিয়ে দিতে যেকোনো কিছুই করতে পারে।" তিনি আরও দাবি করেন যে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো "রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণের জন্য বিকৃত করা হয়েছে।"

তিনি বিক্ষোভের সময় প্রচারিত "১,৪০০" জন নিহত হওয়ার সংখ্যাটিকেও 'প্রচারণার উদ্দেশ্যে ফুলিয়ে ফাঁপানো' বলে দাবি করেন।

নির্বাসন ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার

গত বছরের ৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার সিদ্ধান্তকে তিনি 'অপরিহার্যতা' বলে দাবি করে বলেন, "থেকে গেলে শুধু আমার জীবনই নয়, আমার আশেপাশের লোকদের জীবনও বিপন্ন হতো।"

নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার তার দল আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দিচ্ছে না বলে তিনি অভিযোগ করেন। ইউনূস সরকার ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিলেও, আওয়ামী লীগকে সেই নির্বাচনে অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়া হবে না।

নির্বাসিত হওয়া সত্ত্বেও শেখ হাসিনা 'গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার' করার জন্য তার প্রতিশ্রুতির কথা জানান। তিনি বলেন, "কেবলমাত্র অবাধ, সুষ্ঠু এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনই দেশকে সুস্থ করে তুলতে পারে।" তিনি আশা করেন যে, মানুষ তাকে একজন নেতা হিসেবে স্মরণ করবে যিনি সামরিক শাসনের পর 'সংসদীয় গণতন্ত্র' ফিরিয়ে এনেছিলেন এবং 'লাখ লাখ মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন'।

সাক্ষাৎকারটি শেষ করার সময় শেখ হাসিনা তার অবস্থানে দৃঢ় থেকে বলেন, "কোনো গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নেতাকে কখনো বিচার করা উচিত নয়, যদি সে সহিংস বিদ্রোহের মুখে দেশের সংবিধান রক্ষা করার দায়িত্ব পালন করে।”

এবি/সিএস