বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে অগ্নিকাণ্ডে ১২ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি
বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় অগ্নিকাণ্ড শনাক্ত ও প্রতিরোধে কর্তৃপক্ষের চরম ব্যর্থতা রয়েছে।
আন্তঃবাণী প্রতিনিধি:
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দেশের রপ্তানিমুখী অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর হিসাব অনুযায়ী, এই দুর্ঘটনায় মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা।
সোমবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইএবি) এই তথ্য জানায়। সংগঠনটির নেতারা অভিযোগ করেন, বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় অগ্নিকাণ্ড শনাক্ত ও প্রতিরোধে কর্তৃপক্ষের চরম ব্যর্থতা রয়েছে।
ওষুধশিল্পে বিপর্যয়কর ক্ষতি
বাংলাদেশ ওষুধশিল্প সমিতির তথ্য অনুযায়ী, অগ্নিকাণ্ডে কমপক্ষে ২০০ কোটি টাকার ওষুধের কাঁচামাল পুড়ে গেছে। সমিতির মহাসচিব মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘এই কাঁচামালগুলো দেশের ওষুধ উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর ক্ষয়ক্ষতি হলে শুধু অর্থনৈতিক নয়, উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।’
পোশাক খাতে ধাক্কা
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) জানায়, আগুনে ৯০১টি প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি পণ্য ও কাঁচামাল পুড়ে গেছে, যার ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫০ লাখ মার্কিন ডলার।
বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ইনামুল হক বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনায় বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়।’
অন্যদিকে বায়িং হাউস উইকিটেক্স-বিডির সিইও এ কে এম সাইফুর রহমান জানান, তাদের ৮৬ হাজার ডলারের কাপড় ও ৪৪ হাজার ডলারের আরএফআইডি ট্যাগ আগুনে পুড়ে গেছে।
ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুললেন টেক্সটাইল নেতারা
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল অভিযোগ করেন, ‘এটি কেবল আগুন নয়, বরং দেশের অর্থনীতিকে দুর্বল করার একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র হতে পারে। আমাদের পোশাক খাতের শক্ত অবস্থান ভেঙে দিতে বহিরাগত প্রভাব কাজ করছে।’
ব্যবসায়ীদের দাবি ও ক্ষোভ
ইএবি সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘এই আগুন দেশের রপ্তানি সক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অগ্নি শনাক্তকরণ ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা না থাকা অপরাধের শামিল। আমরা দায়ীদের দ্রুত শাস্তির দাবি জানাই।’
তিনি আরও সতর্ক করেন, ‘এই অগ্নিকাণ্ডের প্রভাব আগামী কয়েক মাসের রপ্তানি আস্থা, উৎপাদন চেইন ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।’
সরকারের পদক্ষেপ ও তদন্ত কমিটি
অগ্নিকাণ্ডের কারণে বিঘ্নিত ফ্লাইট পরিচালনায় সহায়তা দিতে সরকার তিন দিনের জন্য অতিরিক্ত ফ্লাইটের সব চার্জ মওকুফ করেছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছে বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।
এদিকে, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর ঘটনাটি তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে, যার প্রধান করা হয়েছে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরীকে। কমিটিকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অগ্নিকাণ্ড শুধু অবকাঠামোগত বিপর্যয় নয়—এটি দেশের রপ্তানি ও বিনিয়োগে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এখনই স্বচ্ছ তদন্ত ও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে এর পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা রয়ে যাবে।
এবি/সিএস





