সেন্ট মার্টিন-বঙ্গোপসাগর ঘিরে বৈশ্বিক শক্তির বিপজ্জনক খেলা

যুক্তরাষ্ট্র সেন্ট মার্টিন দ্বীপে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের জন্য চাপ দিয়েছিল। তিনি যদি সেই প্রস্তাবে রাজি হতেন, তবে পশ্চিমাদের রাজনৈতিক সমর্থন বজায় রাখতে পারতেন।

Oct 11, 2025 - 12:35
 0
সেন্ট মার্টিন-বঙ্গোপসাগর  ঘিরে বৈশ্বিক শক্তির বিপজ্জনক খেলা
সংগৃহীত

আন্তঃবাণী ডেস্ক: বাংলাদেশের ছোট্ট অথচ কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ সেন্ট মার্টিনকে ঘিরে এখন শুরু হয়েছে বড় শক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক দাবা খেলা। বঙ্গোপসাগরের এই শান্ত দ্বীপটিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের প্রতিযোগিতা ক্রমেই নতুন উত্তেজনার জন্ম দিচ্ছে—যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি থেকে শুরু করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পর্যন্ত প্রভাব ফেলছে।

সম্প্রতি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এক বক্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি দাবি করেন, তার শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্র সেন্ট মার্টিন দ্বীপে সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের জন্য চাপ দিয়েছিল। তিনি যদি সেই প্রস্তাবে রাজি হতেন, তবে পশ্চিমাদের রাজনৈতিক সমর্থন বজায় রাখতে পারতেন। যদিও বর্তমান সরকার এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে, তবে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি ঘিরে নানা বিশ্লেষণ দেখা দিয়েছে।

মাত্র তিন বর্গকিলোমিটারের সেন্ট মার্টিন দ্বীপটি উত্তর-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত। এর ভৌগোলিক অবস্থান মালাক্কা প্রণালীর কাছাকাছি হওয়ায় এটি সামরিক ও বাণিজ্যিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্লেষকরা মনে করেন, যে দেশ এ দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেবে, সে-ই ভারত মহাসাগর অঞ্চলে শক্তির ভারসাম্য পাল্টে দিতে পারবে।

যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ‘ফ্রি অ্যান্ড ওপেন ইন্দো-প্যাসিফিক’ নীতির আওতায় চীনের প্রভাব ঠেকাতে এ অঞ্চলে অবস্থান শক্ত করার কৌশল নিয়েছে। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই তারা সেন্ট মার্টিনে আগ্রহী বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে চীন ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের অবকাঠামো ও অর্থনীতিতে গভীরভাবে প্রবেশ করেছে। ভারতও তার পূর্ব সীমান্তে যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়েও আন্তর্জাতিক মহলে নানা বিশ্লেষণ চলছে। অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের উত্থানকে অনেকে যুক্তরাষ্ট্রপন্থী পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে দেখছেন। তার সঙ্গে পশ্চিমা রাজনৈতিক বৃত্তের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও পূর্বের ঘটনাগুলো এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অস্থিরতা ও তরুণদের নেতৃত্বে আন্দোলনের ধরণ পশ্চিমা সমর্থিত ‘রঙিন বিপ্লব’-এর কৌশলের সঙ্গে মিলে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা, এনজিওদের কার্যক্রম ও আন্তর্জাতিক চাপ—সবকিছু মিলিয়ে একটি বড় ভূ-রাজনৈতিক খেলার ইঙ্গিত মিলছে।

ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র—এই তিন পরাশক্তির প্রতিযোগিতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ। একদিকে আমেরিকার কৌশলগত আগ্রহ, অন্যদিকে চীনের অর্থনৈতিক প্রভাব ও ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ—সব মিলিয়ে সেন্ট মার্টিন এখন এক নতুন ভূরাজনৈতিক রণাঙ্গন।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পথ তাই এখন কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নয়, বরং বৈশ্বিক স্বার্থেরও প্রতিফলন হতে চলেছে। বঙ্গোপসাগরের নীল জলে যে দ্বীপটি একসময় ছিল নিস্তব্ধ, সেখানে এখন ঢেউ তুলছে পরাশক্তির কূটনৈতিক স্রোত।

সূত্র: পার্সটুডে

এবি/সিএস