গর্ভধারণের সবচেয়ে মোক্ষম সময় কখন, জানালেন তাসনিম জারা
নিয়মিত চেষ্টা করলে এক বছরের মধ্যে ৮০ শতাংশের বেশি দম্পতি সফল হন।
আন্তঃবাণী প্রতিনিধি : সন্তান ধারণের পরিকল্পনা থাকলে সঠিক সময়ে প্রস্তুতি নেওয়া ও গর্ভধারণের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় সময় বা ফারটাইল উইন্ডো চিনে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। একাধিক পদ্ধতি একত্রে ব্যবহার করে এই সময়টি সঠিকভাবে নির্ণয় করা গেলে দ্রুত গর্ভধারণের সম্ভাবনা বহুগুণে বাড়ে।
যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজের চিকিৎসক ও সহায় হেলথের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ডা. তাসনিম জারা সম্প্রতি এক ভিডিওতে সন্তান নেওয়ার পূর্বপ্রস্তুতি এবং গর্ভবতী হওয়ার সবচেয়ে সম্ভাবনাময় সময় নির্ণয়ের কার্যকর পদ্ধতিগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। পিরিয়ডের কত দিন পর সহবাস করলে সন্তান হয়, এই প্রশ্নের উত্তর পেতে ফারটাইল উইন্ডো চেনা অপরিহার্য।
নিচে ফারটাইল উইন্ডো চেনার ৫টি নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি তুলে ধরা হলো:
১. সাদাস্রাব পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে গর্ভধারণের সঠিক সময় নির্ণয়
এই পদ্ধতিটি মাসিক নিয়মিত বা অনিয়মিত— উভয় ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, তবে অনিয়মিত মাসিকের জন্য এটি বিশেষভাবে কার্যকর।
পদ্ধতির মূল কথা: মাসিকের পর মেয়েদের সাদাস্রাবের চারটি অবস্থা দেখা যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনাময় অবস্থাটি হলো যখন সাদাস্রাব খুব পাতলা, পিচ্ছিল এবং স্বচ্ছ হয় (কাঁচা ডিমের সাদা অংশের মতো)। এই সময় সাদাস্রাব দুই আঙুল দিয়ে টেনে বড় করা যায় এবং তা ভাঙে না। এই চতুর্থ অবস্থায় গর্ভধারণের সম্ভাবনা প্রায় ৩০ শতাংশের কাছাকাছি (২৮.৬ শতাংশ) থাকে।
কখন চেষ্টা করবেন? যেদিন থেকে পাতলা, পিচ্ছিল সাদাস্রাব দেখা যায়, সেদিন থেকে শুরু করে সাদাস্রাব যাওয়া বন্ধ হওয়ার দিন এবং তার পরের ৩ দিন— এই সময়টা গর্ভধারণের জন্য চেষ্টা করার উত্তম সময়।
সতর্কতা: সহবাস, লুব্রিকেন্ট ব্যবহার, কিছু ওষুধ, বুকের দুধ পান করানো বা যোনিপথের ইনফেকশনের কারণে সাদাস্রাবের পরিবর্তন আসতে পারে, যা এই পদ্ধতির কার্যকারিতা কমাতে পারে।
২. শরীরের তাপমাত্রা মেপে ফারটাইল উইন্ডো জানা
ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু বের হওয়ার পর (ওভিউলেশন) একজন নারীর শরীরের তাপমাত্রা সামান্য ০.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ০.৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট বেড়ে যায়। এই পরিবর্তন নিয়মিত তাপমাত্রা মাপার মাধ্যমে ধরা যায়।
তাপমাত্রা মাপার নিয়ম:
* সময়: প্রতিদিন ঘুম থেকে ওঠার পর, বিছানায় থাকা অবস্থায় এবং কোনো কিছু করার আগে একই সময়ে তাপমাত্রা মাপতে হবে।
* স্থান: বগলের নিচে নয়, মুখের তাপমাত্রা (থার্মোমিটার জিভের নিচে রেখে) মাপতে হবে।
* থার্মোমিটার: সূক্ষ্ম পরিবর্তন বোঝার জন্য সাধারণ পারদ থার্মোমিটারের বদলে ডিজিটাল থার্মোমিটার ব্যবহার করা জরুরি।
কখন চেষ্টা করবেন? একটি নিয়ম মনে রাখতে হবে: ছয়ের পরে তিন। টানা ৬ দিন কম তাপমাত্রার পরে যখন টানা ৩ দিন বেশি তাপমাত্রা থাকে, তখন ফারটাইল উইন্ডো শেষ হতে থাকে। এই পদ্ধতি ফারটাইল উইন্ডো কখন শেষ হচ্ছে তা জানতে সাহায্য করে। সাদাস্রাব পদ্ধতির সাথে এটি মিলিয়ে ব্যবহার করলে সঠিক সময়টি কাজে লাগানো যায়।
৩. স্ট্যান্ডার্ড ডে পদ্ধতি
এই পদ্ধতিটি তাদের জন্য উপযুক্ত, যাদের মাসিকের সাইকেল ২৬ দিনের চেয়ে ছোট নয় এবং ৩২ দিনের চেয়ে বড় নয়।
পদ্ধতির মূল কথা: মাসিক শুরু হওয়ার দিন থেকে হিসেব করে ৮ নম্বর দিন থেকে ১৯ নম্বর দিন পর্যন্ত সময়টিকে ফারটাইল উইন্ডো বা সবচেয়ে সম্ভাবনাময় সময় ধরা হয়।
মাসিকের সাইকেল গণনা: প্রথম যেদিন মাসিক শুরু হয়, সেই দিনটিকে সাইকেলের প্রথম দিন ধরে পরের মাসিক শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত দিনগুলো গোনা হয়।
পরামর্শ: শুধুমাত্র এই পদ্ধতির ওপর নির্ভর না করে অন্যান্য পদ্ধতিও এর সাথে সমন্বয় করে ব্যবহার করা উচিত।
৪. ক্যালেন্ডারে হিসাব রেখে ফারটাইল উইন্ডো জানা
এটি তুলনামূলকভাবে কঠিন হলেও বেশ কার্যকর একটি পদ্ধতি। এই নিয়মে কমপক্ষে ছয় মাস ধরে মাসিকের সাইকেলের দৈর্ঘ্য নোট করে রাখতে হবে।
পদ্ধতির মূল কথা: ছয় মাসের সাইকেলের মধ্যে সবচেয়ে ছোট ও সবচেয়ে লম্বা দুটি সাইকেল বেছে নিতে হবে:
* ফারটাইল উইন্ডোর শুরু: সবচেয়ে ছোট সাইকেল থেকে ১৮ বিয়োগ করতে হবে। (যেমন: ২৬ দিনের সাইকেল হলে, ২৬ - ১৮ = ৮। অর্থাৎ ৮ম দিন থেকে শুরু)।
* ফারটাইল উইন্ডোর শেষ: সবচেয়ে লম্বা সাইকেল থেকে ১১ বিয়োগ করতে হবে। (যেমন: ৩৩ দিনের সাইকেল হলে, ৩৩ - ১১ = ২২। অর্থাৎ ২২তম দিনে শেষ)।
ফলে, উপরের উদাহরণ অনুযায়ী মাসিক শুরু হওয়ার পর ৮ নম্বর দিন থেকে ২২ নম্বর দিন হলো সম্ভাব্য ফারটাইল উইন্ডো।
৫. অন্যান্য পদ্ধতি
এছাড়াও সন্তান ধারণের সময় জানতে আরও কিছু পদ্ধতি ব্যবহার করা যায়:
* ওভুলেশন টেস্ট কিট: ফার্মেসিতে পাওয়া এই কিটগুলো প্রস্রাবে হরমোনের মাত্রা মেপে ডিম্বাণু কখন বের হতে পারে তার আভাস দেয়। তবে এটি তুলনামূলকভাবে দামি।
* মোবাইল অ্যাপ: 'Flo', 'Clue', 'Glow'-এর মতো অ্যাপগুলো মাসিকের তারিখ বসালে ফারটাইল উইন্ডো হিসাব করে দেয়। তবে এগুলো ১০০ শতাংশ নির্ভরযোগ্য নয়, তবে সাইকেলের দৈর্ঘ্য সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ:
ডা. তাসনিম জারা মনে করিয়ে দেন, সবার ফারটাইল উইন্ডো একই সময়ে হয় না এবং একই ব্যক্তির ক্ষেত্রেও মাসে মাসে সময়ের পরিবর্তন হতে পারে। তাই নিজের শরীরের লক্ষণগুলোর (তাপমাত্রা, সাদাস্রাব) দিকে মনোযোগ দেওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আলোচনা করা কোনো পদ্ধতিই ডিম্বাণু বের হওয়ার সঠিক সময় নিশ্চিতভাবে বলতে পারে না, তবে একাধিক পদ্ধতি সমন্বয় করে ব্যবহার করলে সন্তান ধারণের সম্ভাবনা বহুগুণে বেড়ে যায়।
নিয়মিত চেষ্টা করলে এক বছরের মধ্যে ৮০ শতাংশের বেশি দম্পতি সফল হন। তাই ৩-৪ মাস চেষ্টা করে সফল না হলে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। তবে, এক বছর (নারীর বয়স ৩৫ এর বেশি হলে ৬ মাস) নিয়মিত চেষ্টার পরেও সফল না হলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
এবি/সিএস





